Ram Mandir Fund Corruption
বিশেষ প্রতিবেদন
অযোধ্যার রামমন্দিরে ভক্তদের দেওয়া প্রণামীর অর্থ নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। উত্তরপ্রদেশ সরকারের গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT)-এর প্রাথমিক রিপোর্টে অনুদান সংগ্রহ, গণনা ও ব্যাংকে জমা দেওয়ার পুরো ব্যবস্থায় একাধিক গুরুতর ত্রুটির কথা উঠে এসেছে। ইতিমধ্যেই এই ঘটনায় আটজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তদন্ত এখনও চলছে।
টাইমস অফ ইন্ডিয়া, রয়টার্স, দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ইকোনমিক টাইমস-সহ একাধিক জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য এবং তদন্ত-সংক্রান্ত রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে গোটা ঘটনার চিত্র তুলে ধরছে অমৃতবাজার।
অভিযোগের সূত্রপাত কীভাবে?
প্রথমে অভিযোগ ওঠে যে, রামমন্দিরে ভক্তদের দেওয়া অনুদানের অর্থের একটি অংশ আত্মসাৎ হয়েছে। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্টের উদ্যোগে বিষয়টি গুরুত্ব পায়। পরে উত্তরপ্রদেশ সরকার SIT গঠন করে তদন্ত শুরু করে। প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে FIR দায়ের হয় এবং আটজনকে গ্রেফতার করা হয়। তদন্তে প্রায় ৮০ লক্ষ টাকা নগদ উদ্ধার হওয়ার কথাও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিদিন কত অনুদান আসে?
টাইমস অফ ইন্ডিয়া-র তথ্য অনুযায়ী—
- মন্দিরে রয়েছে ৪০টি অনুদান বাক্স (হুন্ডি)।
- সাধারণ দিনে প্রায় ৭৫ হাজার ভক্ত দর্শনে আসেন।
- প্রতিদিন গড়ে ৮ লক্ষ থেকে ১৩ লক্ষ টাকা অনুদান জমা পড়ে।
- বিশেষ উৎসবের দিনে এই অঙ্ক ৫০–৬০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়।
- অনুদান আসে নগদ অর্থ, কয়েন, সোনা ও রুপোর অলঙ্কারের আকারে।
- ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে অনুদান হিসেবে প্রায় ১৫৩ কোটি টাকা জমা পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কীভাবে গণনা করা হয় প্রণামীর অর্থ?
তদন্তে উঠে এসেছে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা।
প্রথমে নির্দিষ্ট সময়ে ট্রাস্টের প্রতিনিধি, নিরাপত্তাকর্মী ও অনুমোদিত কর্মীদের উপস্থিতিতে অনুদান বাক্স খোলা হয়। এরপর সমস্ত নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী লোহার নিরাপদ কনটেইনারে ভরে Pilgrim Facilitation Centre-এ নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে মোট ৪৪ জন আউটসোর্স কর্মী দুই শিফটে কাজ করেন। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা এবং দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত গণনা চলে। কর্মীদের পকেটবিহীন পোশাক পরার কথা এবং গণনার সময় বাইরে যাওয়ার অনুমতি থাকে না।
গণনা শেষে টাকা প্যাকেটবন্দি করে সিল করা হয় এবং পরে স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (SBI)-এর শাখায় জমা করা হয়। সব অর্থ সরাসরি ট্রাস্টের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা পড়ার কথা।
তাহলে গাফিলতি কোথায় ছিল?
SIT-এর প্রাথমিক তদন্তে কয়েকটি বড় দুর্বলতা সামনে এসেছে।
১. CCTV-র ‘ব্লাইন্ড স্পট’
গণনা কক্ষের এমন কিছু অংশ ছিল যেখানে CCTV ক্যামেরার নজর পৌঁছাত না। তদন্তে অভিযোগ, অভিযুক্তরা সেই অংশগুলিকেই কাজে লাগিয়েছিল। এমনকি কিছু CCTV ফুটেজ নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সংরক্ষণও করা হয়নি।
২. SOP মানা হয়নি
গণনা ও নগদ অর্থ পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট Standard Operating Procedure (SOP) থাকলেও তার একাধিক ধাপ অনুসরণ করা হয়নি বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
৩. কর্মীদের যথাযথ তল্লাশি হয়নি
নিয়ম অনুযায়ী কর্মীদের পকেটবিহীন পোশাক পরার কথা এবং প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় তল্লাশি হওয়ার কথা। কিন্তু তদন্তে দেখা গেছে, এই নিয়ম সবসময় কঠোরভাবে মানা হয়নি।
৪. নগদ অর্থ খোলা অবস্থায় রাখা
কিছু ক্ষেত্রে গণনার পর টাকা সঙ্গে সঙ্গে সিল করা নিরাপদ ব্যাগে রাখা হয়নি। এতে অর্থ সরানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে তদন্তকারীদের মত।
৫. আউটসোর্স কর্মীদের উপর নির্ভরতা
অনুদান গণনার মূল কাজ করছিলেন আউটসোর্স কর্মীরা। কিন্তু তাদের উপর পর্যাপ্ত নজরদারি, দায়িত্ব নির্ধারণ এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা ছিল দুর্বল।
৬. রেকর্ড সংরক্ষণে ঘাটতি
তদন্তে বলা হয়েছে, নগদ অর্থ গ্রহণ, গণনা ও ব্যাংকে জমা দেওয়ার প্রতিটি ধাপের পর্যাপ্ত নথিপত্র সংরক্ষণ করা হয়নি। ফলে পরে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।
৭. বহু ধাপে হাতে অর্থ স্থানান্তর
অনুদান বাক্স থেকে ব্যাংকে জমা পড়া পর্যন্ত একাধিক ধাপে হাতে হাতে অর্থ স্থানান্তর করা হচ্ছিল। তদন্তকারীদের মতে, এই ব্যবস্থায় প্রতিটি ধাপেই অনিয়মের ঝুঁকি ছিল।
তদন্তে আর কী উঠে এসেছে?
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অভিযুক্তরা CCTV-র অদৃশ্য অংশ ব্যবহার করে নগদ অর্থ সরিয়ে শৌচাগারের মতো জায়গায় লুকিয়ে রাখত। পরে সুযোগ বুঝে সেই অর্থ বাইরে নিয়ে যাওয়া হতো। এই তথ্য তদন্তের অংশ হিসেবে উঠে এসেছে।
এখন কী অবস্থা?
SIT-কে তদন্ত শেষ করার জন্য অতিরিক্ত সময় দেওয়া হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থা আরও নথি, কর্মী নিয়োগ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখছে। ইতিমধ্যেই তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত করা হয়েছে।
বড় প্রশ্ন
অযোধ্যার রামমন্দির শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাসের প্রতীক। তাই ভক্তদের অনুদান ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, কঠোর নিরাপত্তা এবং নির্ভুল হিসাবরক্ষণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্টে কী উঠে আসে, সেটাই এখন দেখার।
সম্পাদকের নোট: এই প্রতিবেদনটি টাইমস অফ ইন্ডিয়া, রয়টার্স, দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ইকোনমিক টাইমস-সহ একাধিক জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য এবং SIT-এর তদন্ত-সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত। তদন্ত এখনও চলছে। অভিযোগগুলির বিষয়ে আদালত বা তদন্তকারী সংস্থার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও প্রকাশিত হয়নি।
