বর্ষাকালীন অধিবেশনের আগে সর্বদলীয় বৈঠক: আমন্ত্রণের পর মোদি-সুদীপ সাক্ষাৎ ঘিরে জল্পনা

Modi-Sudip meeting ahead of the monsoon session

নয়াদিল্লি:

সংসদের আসন্ন বর্ষাকালীন অধিবেশনকে সামনে রেখে প্রথাগত সর্বদলীয় বৈঠকের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে কেন্দ্র সরকার。 এই লক্ষ্যে আগামী রবিবার (১৯ জুলাই) সকাল ১১টায় সংসদ ভবন অ্যানেক্সের মূল কমিটি কক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভার আহ্বান করা হয়েছে。 কেন্দ্রীয় সংসদীয় বিষয়কমন্ত্রী কিরেণ রিজিজু সংসদের উভয় কক্ষের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ফ্লোর লিডার বা সংসদীয় দলনেতাদের এই বৈঠকে উপস্থিত থাকার জন্য আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র পাঠিয়েছেন। এই আমন্ত্রিতের তালিকায় একটি বিশেষ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) থেকে বেরিয়ে আসা বিক্ষুব্ধ সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে, যাঁরা সম্প্রতি নবগঠিত ‘ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়া’ (এনসিপিআই)-তে যোগ দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর সাথে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎ

এদিকে, রবিবারের সর্বদলীয় বৈঠকের ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ শনিবার সন্ধ্যায় একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ সামনে এসেছে। তৃণমূলত্যাগী এনসিপিআই সাংসদ তথা লোকসভায় দলটির দলনেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় নতুন দিল্লির ৭, লোককল্যাণ মার্গে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে গিয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে সাক্ষাৎ করেন। সংসদের বাদল বা বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে এবং সরকারের ডাকা সর্বদলীয় বৈঠকের ঠিক আগের সন্ধ্যায় এই দুই নেতার একান্ত বৈঠকটি রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক জল্পনার জন্ম দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন সংসদীয় দল হিসেবে এনসিপিআই-এর অবস্থান এবং আসন্ন অধিবেশনে রণকৌশলগত নানা দিক নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

রিজিজুর চিঠি ও সংসদীয় সহযোগিতা

এর আগে সংসদীয় বিষয়কমন্ত্রী কিরেণ রিজিজু এনসিপিআই-এর লোকসভার দলনেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দলের নবনিযুক্ত চিফ হুইপ কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে প্রেরিত চিঠিতে সংসদের উভয় কক্ষের কার্যক্রম সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্নে পরিচালনার জন্য সকল রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

চিঠিতে মন্ত্রী উল্লেখ করেন:

“আপনি এবং আপনার সঙ্গে আরও ১৯ জন সংসদ সদস্য সম্প্রতি ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়া (এনসিপিআই)-তে যোগ দিয়েছেন এবং লোকসভার মাননীয় স্পিকারের কাছে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্য আবেদন জানিয়েছেন, যা বর্তমানে বিবেচনাধীন রয়েছে। আসন্ন বর্ষাকালীন অধিবেশনে সংসদের উভয় কক্ষে যেসকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং আইনপ্রণয়ন সংক্রান্ত কার্যাবলী উত্থাপিত হতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে আলোচনার জন্য লোকসভা ও রাজ্যসভার রাজনৈতিক দলগুলোর ফ্লোর লিডারদের বৈঠকে আপনাদের আমন্ত্রণ জানাতে পেরে আমি আনন্দিত। সংসদের সুষ্ঠু কার্যধারা বজায় রাখতে আমি আপনাদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি।”

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও দলগত অবস্থান পরিবর্তন

এই প্রশাসনিক আমন্ত্রণ এবং মোদি-সুদীপ সাক্ষাতের নেপথ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সমসাময়িক রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি বড় ধরনের সাংগঠনিক রদবদল। লোকসভার মোট ২০ জন তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মূল দল থেকে পৃথক হয়ে ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়া (এনসিপিআই)-র সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। একই সঙ্গে এই নতুন সংসদীয় গোষ্ঠীটি কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটকে (এনডিএ) সমর্থন প্রদানের নীতিগত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে।

এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বিক্ষুব্ধ সাংসদদের প্রতিনিধি দল চলতি মাসের শুরুর দিকে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। সেই বৈঠকে তাঁরা সংসদে নিজেদের জন্য পৃথক আসন বিন্যাস এবং একটি স্বতন্ত্র সংসদীয় গোষ্ঠী বা দল হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির দাবি জানান। আইনগত ও সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী বর্তমানে স্পিকারের দফতরে এই আবেদনটি পর্যালোচনার অধীন রয়েছে।

সর্বদলীয় বৈঠকের লক্ষ্য ও গুরুত্ব

প্রতি বছর সংসদের অধিবেশন শুরুর প্রাক্কালে সরকারের পক্ষ থেকে এই ধরনের সর্বদলীয় বৈঠক ডাকার উদ্দেশ্য হলো—অধিবেশন চলাকালীন আইনগত ও নীতিগত বিষয়গুলো নিয়ে বিরোধী ও সহযোগী দলগুলোর সাথে একটি প্রাথমিক আলোচনা সম্পন্ন করা। এর মাধ্যমে বিভিন্ন বিল পাস এবং জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে একটি রাজনৈতিক ঐকমত্য বা বোঝাপড়া তৈরির চেষ্টা করা হয়。

বর্তমান পরিস্থিতিতে, লোকসভার স্পিকারের পক্ষ থেকে এনসিপিআই-এর চূড়ান্ত স্বীকৃতি আসার আগেই সংসদীয় বিষয়কমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এই নতুন গোষ্ঠীর নেতাদের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো এবং ঠিক তার পরেই প্রধানমন্ত্রীর সাথে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক সাক্ষাৎকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহল বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। আগামী ১৯ জুলাইয়ের এই বৈঠক এবং ২০ জুলাই থেকে শুরু হতে যাওয়া বর্ষাকালীন অধিবেশনে সরকারি দলের রণকৌশল এবং নতুন রাজনৈতিক জোটের ভূমিকা কী হবে, তা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।