Party-switching in Indian parliamentary politics
বিশেষ প্রতিবেদন
কলকাতা: একটি যুগান্তকারী প্রবাদ একদা ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক মননকে পথ দেখাত— “What Bengal thinks today India thinks tomorrow কিন্তু ২০২৬ সালের মে মাসের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের পর আজ আর সেই গর্বের উচ্চারণ নয়, বরং এক চরম লজ্জিত ও হতবাক নীরবতা গ্রাস করেছে এই রাজ্যকে। বাংলার রাজনীতিতে দলবদল নতুন কোনো ব্যাধি নয়, কিন্তু আদর্শের এই স্তরে অবক্ষয় এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের এমন নজিরবিহীন দেউলিয়া অবস্থা ভারতের সংসদীয় ইতিহাস আগে কখনো প্রত্যক্ষ করেছে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে।
ফিরে যাওয়া যাক ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের উত্তাল দিনগুলোতে। কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপির বিপুল অর্থবল, রাষ্ট্রশক্তির দাপট এবং নরেন্দ্র মোদি সহ শীর্ষ নেতৃত্বের লাগাতার প্রচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাংলার মানুষ ম্যান্ডেট দিয়েছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবল বিজেপি-বিরোধী অবস্থানের ওপর আস্থা রেখে রাজ্যের ৪২টি আসনের মধ্যে ২৮টিতে তৃণমূল কংগ্রেসকে জয়ী করেছিল বাংলার জনতা। তারকা থেকে শুরু করে পোড়খাওয়া রাজনীতিক— যাঁরা সেদিন ঘাসফুল প্রতীকে দিল্লির সংসদে গিয়েছিলেন, তাঁদের ঝুলির প্রতিটি ভোটের নেপথ্যে ছিল একটাই মূল চালিকাশক্তি: কট্টর বিজেপি-বিরোধিতা। বাংলার মানুষ তাঁদের ব্যক্তি-পছন্দে ভোট দেননি, দিয়েছিলেন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার তাগিদে।
অথচ, ২০২৬ সালের ৪ঠা মে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট হতেই চেনা ছবিটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। ক্ষমতার হাতবদল হতেই শুধু যে বিধানসভার বিধায়করা শিবির বদলালেন তা-ই নয়, লোকসভার ২৮ জন সাংসদের মধ্যে ২০ জনই রাতারাতি দলত্যাগ করলেন। তাঁরা কোনো একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক আদর্শে শামিল হননি, বরং নতুন, অচেনা এক রাজনৈতিক ব্যানারে একত্রিত হয়ে নিজেদের ‘আসল’ তৃণমূল বলে দাবি করলেন। ট্র্যাজেডি এখানেই শেষ নয়; সংসদের স্পিকারের ঘরে সেই দলছুট ২০ জনের গোষ্ঠী আজ লোকসভায় মূল দলটির চেয়েও বড় দল হিসেবে আইনি স্বীকৃতি পেয়ে গেছে।
সবচেয়ে বড় প্রহসন ও আদর্শগত দ্বিচারিতা লুকিয়ে রয়েছে তাঁদের বর্তমান অবস্থানে। তাঁরা সরাসরি বিজেপির পতাকা হাতে তুলে নেননি, অথচ খাতায়-কলমে তাঁরা আজ এনডিএ (NDA) জোটের শরিক। অর্থাৎ, দিল্লির শাসক শিবিরের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে তাঁরা নিঃশর্ত সমর্থন জানাবেন। যে আমজনতা কড়া রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে স্রেফ বিজেপিকে রুখতে ইভিএমের বোতাম টিপেছিলেন, তাঁদের সেই পবিত্র আমানতকে সস্তা পণ্যের মতো বিক্রি করে দেওয়া হলো এনডিএ-র দরবারে। একে রাজনৈতিক দেউলিয়া অবস্থা বললে শব্দটির অবমাননা হয়; এটি আসলে কোটি কোটি ভোটারের পিঠে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতার ছুরি মারা।
ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে দলবদল বা রাজনৈতিক ডিগবাজি নতুন নয়, তবে ২০২৬ সালে বাংলার ২০ জন সাংসদের এই দলত্যাগ এবং এনডিএ-তে যোগ দেওয়ার ঘটনাটি যে চরম আদর্শগত দেউলিয়া অবস্থা তৈরি করেছে, তার সঙ্গে অতীতের তিনটি ঐতিহাসিক উদাহরণের হুবহু বা আংশিক মিল পাওয়া যায়।
১. ‘আয়া রাম, গয়া রাম’ সংস্কৃতি (১৯৬৭)
রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা বা আদর্শহীনতার প্রসঙ্গ উঠলেই ভারতের ইতিহাসে হরিয়ানার বিধায়ক গয়া লালের নাম সবার আগে আসে। ১৯৬৭ সালে তিনি মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে তিনবার দল পরিবর্তন করেছিলেন (কংগ্রেস থেকে ইউনাইটেড ফ্রন্ট, আবার কংগ্রেস এবং ৯ ঘণ্টার মধ্যে আবারও ইউনাইটেড ফ্রন্ট)। সেই ঘটনার পর থেকেই ভারতীয় রাজনীতিতে ‘আয়া রাম, গয়া রাম’ প্রবাদের জন্ম হয়। তবে গয়া লাল একা ছিলেন, আর বাংলায় ২০ জন সাংসদ একসাথে জনম্যান্ডেটকে পদদলিত করে এই সংস্কৃতির এক আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিলেন।
২. মেঘালয় ও মণিপুরের ‘আইনি কারসাজি’ (২০২১-২০২২)
তৃণমূলের সাংসদরা সরাসরি বিজেপিতে না গিয়ে যেভাবে আলাদা দল তৈরি করে লোকসভায় বড় দলের স্বীকৃতি নিলেন এবং এনডিএ-র শরিক হলেন, তার কৌশলগত মিল রয়েছে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজনীতির সঙ্গে।
- ২০২১ সালে মেঘালয়ে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস (AITC) কোনো ভোট না পেয়েও রাতারাতি প্রধান বিরোধী দল হয়ে গিয়েছিল, কারণ কংগ্রেসের ১৭ জন বিধায়কের মধ্যে ১২ জন একযোগে মুকুল সাংমার নেতৃত্বে তৃণমূলে যোগ দেন।
- ২০২২ সালে মণিপুরে জনতা দল ইউনাইটেডের (JDU) ৬ জন বিধায়কের মধ্যে ৫ জন একযোগে বিজেপিতে শামিল হন।
সেখানে দলত্যাগ বিরোধী আইন (Anti-Defection Law) এড়াতে দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) সদস্য ভাঙার যে কৌশল নেওয়া হয়েছিল, ২০২৬ সালে বাংলার ২০ জন সাংসদ ঠিক সেই একই আইনি ফাঁক গলে মানুষের ভোটকে পণ্যের মতো ব্যবহার করলেন।
৩. শিবসেনা ও এনসিপি-র ভাঙন (২০২২-২০২৩)
আদর্শগত বৈপরীত্যের সবচেয়ে বড় নজির ছিল মহারাষ্ট্রের রাজনীতি। ২০২২ সালে একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বে শিবসেনার একটি বড় অংশ এবং ২০২৩ সালে অজিত পাওয়ারের নেতৃত্বে এনসিপি-র (NCP) একটি বড় অংশ মূল দল থেকে আলাদা হয়ে যায়।
- মজার বিষয় হলো, তাঁরা নিজেরা আলাদা হয়ে মূল দলটির নাম ও প্রতীক দাবি করেন এবং নির্বাচন কমিশন ও স্পিকারের সিলমোহর পেয়ে যান।
- ঠিক একইভাবে বাংলার এই ২০ জন সাংসদও আজ মূল তৃণমূলের চেয়ে লোকসভায় নিজেদের বড় দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন।
আজ দেশের সচেতন নাগরিক মহলে একটাই বড় প্রশ্ন— কিসের এত ভয়? কোন অদৃশ্য চাবুকের আঘাতে এই কুড়ি জন জনপ্রতিনিধির বিবেক রাতারাতি অবশ হয়ে গেল? এটা কি কোনো কেন্দ্রীয় এজেন্সির ভয়, নাকি ক্ষমতার অলিন্দে টিকে থাকার আদিম লালসা? যে নেতারা কয়েক মাস আগেও দিল্লির স্বৈরাচারী নীতির বিরুদ্ধে সংসদের ভেতরে ও বাইরে গলা ফাটিয়েছেন, আজ কোন মন্ত্রবলে তাঁরা সেই চত্বরেই মাথা নত করলেন?
বাংলা আজ কোনো দিশা দেখাচ্ছে না, বরং ভারতীয় গণতন্ত্রের বুকে এক স্থায়ী কলঙ্ক তিলক এঁকে দিচ্ছে। ভোটারদের আবেগ, বিশ্বাস আর আদর্শকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তৈরি হওয়া এই নতুন সমীকরণ আসলে এক অশনি সংকেত। যদি নির্বাচনের মূল ভিত্তি— অর্থাৎ জনমতই এভাবে কেনাবেচা হয়ে যায়, তবে আর গণতন্ত্রের উৎসবের কী প্রাসঙ্গিকতা রইল? বাংলার মানুষ আজ নিঃশব্দে কাঁদছে, আর দেশ দেখছে এক সময়ের প্রগতিশীল চিন্তার আঁতুড়ঘরের এই চরম নৈতিক পতন। এই বিবেকের দেউলিয়াপনার জবাব কি কোনোদিন মিলবে? উত্তরটা ভবিষ্যতের গর্ভেই তোলা রইল।
