Delhi turns into a battlefield in protest against question paper leaks.
বিশেষ প্রতিবেদন
সোমবার সংসদের বাদল অধিবেশনের প্রথম দিনেই শিক্ষা ক্ষেত্রে চরম বিশৃঙ্খলা এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে দেশজুড়ে তীব্র ছাত্র ও যুব আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানী দিল্লির সেন্ট্রাল দিল্লি এলাকা থেকে শুরু করে গুজরাটের আহমেদাবাদ পর্যন্ত এই বিক্ষোভের আঁচ পৌঁছায়। দিল্লিতে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগ করে, যার ফলে শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ২০২১ সালের কৃষক আন্দোলনের পর এই প্রথম সেন্ট্রাল দিল্লিতে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
দিল্লির রাজপথে ধুন্ধুমার, ব্যাহত ইন্টারনেট পরিষেবা
সোমবার বাদল অধিবেশনের প্রথম দিনে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) সমর্থিত হাজার হাজার ছাত্র ও যুবক সংসদ অভিমুখে মিছিল শুরু করলে সেন্ট্রাল দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে এগোনোর চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনী তাদের বাধা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ এবং কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।
বিক্ষোভের খবর ও ছবি ছড়িয়ে পড়া রুখতে প্রশাসন সেন্ট্রাল দিল্লির প্রায় ১৫০টি মোবাইল টাওয়ারের ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেয়। এর ফলে গণমাধ্যমকর্মী ও সাধারণ মানুষ চরম বিপাকে পড়েন এবং অনেকেই সংবাদের তথ্য আদান-প্রদানের জন্য স্থানীয় দোকান ও প্রতিষ্ঠানের ওয়াই-ফাই (WiFi) হটস্পটের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। এই ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের তীব্র সমালোচনা করেছে ‘সফ্টওয়্যার ফ্রিডম ল’ সেন্টার’ (SFLC)। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, এই ধরনের পদক্ষেপ নাগরিকদের স্বাধীন মতামত প্রকাশ এবং তথ্য জানার অধিকারের পরিপন্থী।
শতাধিক আহত ও আটক
পুলিশি পদক্ষেপের কারণে বহু আন্দোলনকারী আহত হয়েছেন। hospital সূত্রে জানা গেছে, রাম মনোহর লোহিয়া (RML) হাসপাতালে প্রায় ৬৫ জন এবং লেডি হার্ডিঞ্জ মেডিকেল কলেজে অন্তত ৩৮ জন আহত বিক্ষোভকারীকে নিয়ে আসা হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, আহতদের শরীরে হাড় ভাঙা, মাথায় আঘাত, কাঁদানে গ্যাসের কারণে চোখ ও শ্বাসনালীর সমস্যা এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে ফোলা জখম দেখা গেছে।
অন্যদিকে, গুজরাটের আহমেদাবাদে একই ইস্যুতে বিক্ষোভ দেখানোর সময় আশ্রম রোডের এমজে লাইব্রেরির কাছ থেকে প্রায় ১৫০ জন আন্দোলনকারীকে আটক করেছে পুলিশ। সেখানে উপস্থিত কলেজ পড়ুয়ারা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে স্লোগান দেন। লদাখের বিশিষ্ট সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো এই আন্দোলনকে “স্মরণীয় সাফল্য” বলে অভিহিত করেছেন।
কলকাতার রাজপথেও প্রতিবাদের আঁচ, কলেজ স্ট্রিটে বিক্ষোভ
দিল্লির ঘটনার সমান্তরালে সোমবার কলকাতার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা কেন্দ্র কলেজ স্ট্রিট এলাকাতেও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন বিভিন্ন বামপন্থী ও বিরোধী ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA) বিলুপ্ত করা এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দেন।
বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ এ দিন সল্টলেকের সিজিও (CGO) কমপ্লেক্স এবং বিকাশ ভবনের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের মাঝপথেই আটকে দেয়। আন্দোলনরত এক ছাত্র প্রতিনিধি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই চক্রটি কোটি কোটি সাধারণ ও মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীর স্বপ্নকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। দিল্লি বা আহমেদাবাদে পুলিশ লেলিয়ে এই কণ্ঠ রোধ করা যাবে না, কলকাতা থেকে আমাদের এই প্রতিবাদ জারি থাকবে।”
কলকাতার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের একটি অংশও শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের প্রতি নৈতিক সমর্থন জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রবেশিকা পরীক্ষার এই ধারাবাহিক অসঙ্গতি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
এই গণবিক্ষোভ ও পুলিশি পদক্ষেপের পর দেশের রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক ব্যক্তিত্ব ও বিশিষ্টজনেরা নিজেদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন:
- রাহুল গান্ধী (লোকসভার বিরোধী দলনেতা): সরকারের তীব্র সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, দেশে ১৫২টি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সাড়ে সাত কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, অথচ প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে তিনি অভিযোগ করেন, সরকার যুবসমাজের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে।
- অখিলেশ যাদব (সমাজবাদী পার্টির প্রধান): সংসদ ভবন চত্বরে রাহুল গান্ধীর সাথে জরুরি আলোচনার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, “সংসদ মূলতবি থাকার সময় আমরা সমসাময়িক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলছিলাম, যার মধ্যে চলমান ছাত্র ও যুব আন্দোলন নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।”
- আশুতোষ রাঙ্কা (সিজেপি মুখপাত্র): বিক্ষোভের পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, “আজ দিল্লির রাস্তায় লাখ লাখ যুবকের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে তারা বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়েছেন। একই সাথে দিল্লি পুলিশ যেভাবে বলপ্রয়োগ করেছে, তার নিন্দা জানানোর ভাষা নেই।”
- গীতাঞ্জলি আংমো (অ্যাক্টিভিস্ট সোনম ওয়াংচুকের স্ত্রী): যুবসমাজের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে সাধুবাদ জানিয়ে সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, “আজকের এই প্রতিবাদ একটি যুগান্তকারী এবং সফল পদক্ষেপ।”
- সামাজিক ও চলচ্চিত্র জগতের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
- এই গণবিক্ষোভ ও পুলিশি পদক্ষেপের পর দেশের রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন এবং নিজেদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন:
- শাবানা আজমি (বর্ষীয়ান অভিনেত্রী): প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ও চলমান আন্দোলনের তীব্রতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি জানান, তার স্বামী জাভেদ আখতার ইতিমধ্যে এই বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। তিনি নিজে জন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন। চলচ্চিত্র জগতের একটি অংশের এই বিষয়ে নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি জানান, যুবসমাজের এই ন্যায্য লড়াইয়ে সকলের পাশে থাকা উচিত।
- প্রকাশ রাজ (অভিনেতা): আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি বলপ্রয়োগের তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। যুবকদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে বাধা দেওয়া এবং সোনম ওয়াংচুকের মতো ব্যক্তিত্বকে আটক করার পদক্ষেপকে তিনি সরকারের “ভীতি ও স্বৈরাচারী মনোভাবের লক্ষণ” বলে অভিহিত করেছেন। পরবর্তীতে তিনি জন্তর মন্তরের প্রতিবাদ স্থলেও সশরীরে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ান।
- পা রঞ্জিত (চলচ্চিত্র পরিচালক): সোশ্যাল মিডিয়ায় এক বিবৃতিতে তামিল পরিচালক পা রঞ্জিত আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে চলা একটি আন্দোলনকে দমানোর জন্য বলপ্রয়োগ না করে, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর উচিত শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হয়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। দেশের ভবিষ্যৎ যেখানে বাজি, সেখানে দমনপীড়ন কোনো সমাধান নয়।”
- হেমা মালিনী ও কঙ্গনা রানাওয়াত (অভিনেত্রী ও সংসদ সদস্য): অন্যদিকে, বলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেত্রী হেমা মালিনী এবং কঙ্গনা রানাওয়াত চলমান সংসদ অধিবেশন চত্বরে এই আন্দোলনের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। হেমা মালিনী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “রাস্তায় নেমে এভাবে বিশৃঙ্খলা বা আন্দোলন করে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মোদী সরকার দেশের শিক্ষা ও যুব সমাজের উন্নয়নে কাজ করছে। কোনো ক্ষোভ থাকলে তা মুখোমুখি আলোচনার টেবিলে বসে সমাধান করা উচিত।” কঙ্গনা রানাওয়াতও এই বিক্ষোভের পেছনে রাজনৈতিক উস্কানি রয়েছে বলে দাবি করেন এবং বিরোধীদের হট্টগোলের সমালোচনা করেন।
এই আন্দোলনের রেশ পৌঁছেছে সংসদের অন্দরেও। উত্তরপ্রদেশের আসন্ন উপনির্বাচনের জোট সমীকরণের আবহে বিরোধী শিবিরের দুই শীর্ষ নেতার এই বৈঠকটিকে রাজনৈতিক মহল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, দিল্লির জন্তর মন্তর ও পার্লামেন্ট স্ট্রিট এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ কর্মী মোতায়েন রাখা হয়েছে।
