একুশে জুলাই: উত্থানের অগ্নিপরীক্ষা থেকে অস্তিত্বের লড়াইয়ে বাংলার ‘অগ্নিকন্যা’

Mamata Banerjee’s trial by fire on July 21.

বিশেষ প্রতিবেদন:
কলকাতার চেনা জুলাইয়ের আকাশ। মেঘ-বৃষ্টির লুকোচুরি আর ভ্যাপসা গরম। কিন্তু বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে এই একটা দিন শুধু আবহাওয়ার হিসেব মেলানোর নয়, আবেগ আর ইতিহাসের গতিপথ মাপার দিন। একুশে জুলাই। যে দিনটি একই সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক লড়াকু নেত্রীর রূপকথার মতো উত্থান এবং তিন দশক পর, তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম এক অস্তিত্বের লড়াইয়ের সঙ্গে।

আজকের প্রেক্ষাপট আর ১৯৯৩ সালের সেই রক্তঝরা ২১ শে জুলাই— মাঝখানে বয়ে গেছে দীর্ঘ ৩৩ বছর। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো একক দিন কোনো নেত্রীর ভাগ্যের সঙ্গে এভাবে সমার্থক হয়ে ওঠেনি, যেভাবে মমতার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ‘একুশে’। কিন্তু ২০২৬-এর এই একুশে জুলাই যেন সম্পূর্ণ আলাদা। এবার আর মহাকরণ অভিযানের সেই তরুণী যুব কংগ্রেস নেত্রী নেই, নেই ২০১১ সালের ৩৪ বছরের বাম দুর্গ গুঁড়িয়ে দেওয়ার সেই অপরাজেয় অহংকার। এবারের একুশে জুলাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে এক চরম পরীক্ষা— পতনের খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে ফের ঘুরে দাঁড়ানোর পরীক্ষা।

১৯৯৩: যখন অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন মমতা
ফিরে যাওয়া যাক ১৯৯৩ সালের সেই ২১ শে জুলাইয়ে। রাইটার্স বিল্ডিংস্ অভিযানের ডাক দিয়েছিলেন তৎকালীন যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৩ জন তরতাজা কর্মী। সেই রক্তক্ষয়ী দিনটিই বাংলার রাজনীতিতে সমস্ত আলো কেড়ে নিয়েছিল মমতার ওপর।

তৎকালীন বাংলায় গনি খান চৌধুরী, প্রণব মুখোপাধ্যায়, প্রিয় রঞ্জন দাশমুন্সি কিংবা সোমেন মিত্রের মতো বাঘা বাঘা নেতারা প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছেন। বামেদের বিরুদ্ধে গর্জন করেছেন ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে সেই বিশ্বাসটা তৈরি করতে পারেননি। বারবার সামনে এসেছে ‘বাম-কংগ্রেস সেটিং’ তত্ত্ব। দিল্লির হাইকম্যান্ডের সঙ্গে আলিমুদ্দিনের গোপন সখ্যতার যে অভিযোগ মানুষ বিশ্বাস করত, তারই চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন মমতা।

যখন গোটা বাংলা ধরে নিয়েছিল এ রাজ্যে বাম শাসনের অবসান অসম্ভব, ঠিক তখনই সেই অসম্ভবকে সম্ভব করার বীজ বোনা হয়েছিল ১৯৯৩-এর একুশে জুলাইয়ে। এরপর সীতারাম কেশরীর জমানায় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে নিজের দল তৃণমূল কংগ্রেস গঠন। মানুষের আবেগ, বিশেষ করে বাম-বিরোধী মানুষের ভরসার একমাত্র নাম হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে একসময় বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে আসন বাড়িয়ে নেওয়া, কেন্দ্রে মন্ত্রিত্ব করা, এবং পরবর্তীতে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের হাত ধরে ২০১১ সালে ইতিহাস তৈরি করা— যার উৎসভূমি ছিল ওই একুশে জুলাইয়ের মঞ্চই।

২০২৬: ভাঙনের মুখে একা লড়াকু নেত্রী
কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর। যে মঞ্চ থেকে গত ১৫ বছর ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জাতীয় রাজনীতির দিশা দেখিয়েছেন, দেশের তাবড় তাবড় বিরোধী নেতাদের এককাট্টা করে মোদী-শাহের বিরুদ্ধে হুঙ্কার ছেড়েছেন, ২০২৬ সালের এই একুশে জুলাইয়ে এসে সেই মঞ্চটাই যেন খণ্ডিত, রক্তাক্ত।আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে এক অদ্ভুত ও নজিরবিহীন বাস্তবতা। যে নেতাদের তিনি একদিন অন্ধের মতো বিশ্বাস করতেন, যাদের নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন, যাদের নিজের প্রতীকে লোকসভায় পাঠিয়েছেন— আজ তাদের একটা বড় অংশ তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন।

এবারের একুশে জুলাই বাংলা দেখছে এক অভূতপূর্ব ভাঙন:

মমতার একুশে: তৃণমূল নেত্রী নিজে যখন বিড়লা তারামণ্ডলের সামনে একুশের সভা করছেন, তখন তাঁর একসময়ের বিশ্বস্ত সেনাপতিরা আজ তাঁর চরম বিরোধী।নব তৃণমূলের একুশে: ধর্মতলার মেয়র রোডে ‘নব তৃণমূল’ অর্থাৎ দল ছেড়ে বেরিয়ে আসা অধিকাংশ বিধায়ক আজ আলাদা মঞ্চ বেঁধে একুশের সভা করছেন। যে আলো একদিন মমতার মঞ্চে থাকত, তা আজ অন্য শিবিরের দখলে।

দিল্লির একুশে: যে সাংসদদের তিনি নিজের হাতে লোকসভায় পাঠিয়েছিলেন, তাঁরা আজ একুশে জুলাই পালন করছেন দিল্লিতে, মহাত্মা গান্ধীর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানিয়ে।

শুভেন্দু অধিকারী: যিনি কয়েক বছর আগেও একুশের মঞ্চে মমতার ঠিক পাশটিতে দাঁড়িয়ে অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে কাজ করতেন, আজ তিনিই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তৃণমূলকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করাই আজ যাঁর একমাত্র লক্ষ্য।২০২৬-এর এই একুশে জুলাইয়ে যোগ হয়েছে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়। ঠিক এই দিনটিতেই তৎকালীন ২১শে জুলাইয়ের পুলিশি ফায়ারিংয়ের ঘটনার তদন্তকারী কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ করে ময়দানে নেমেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। যে ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াকু ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছিল, সেই ঘটনার কমিশন রিপোর্টকে হাতিয়ার করেই এবার তৃণমূল নেত্রীকে কাঠগড়ায় তুলতে চাইছে তাঁরই এককালের সেনাপতি। ফলে, এবারের একুশে জুলাই কেবল শক্তিপ্রদর্শনের মঞ্চ নয়, বরং ইতিহাসের দায় আর বর্তমানের লড়াইয়ের এক চূড়ান্ত পরীক্ষা ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে

অগ্নিকন্যা কি পারবেন আবার আগুন ছড়াতে?
চারিদিকে বিপুল প্রতিকূলতা। বিশ্বস্ত অনুগামীদের দলবদল, দলের ভেতরে ভাঙন আর বয়স— এই সবকিছুর সামনে দাঁড়িয়ে ২০২৬-এর এই জুলাইয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বড্ড একা। আজ আর শুধু ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই নয়, আজ লড়াই প্রমাণ করার যে, দল ভাঙলেও বাংলার লাখ লাখ সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এখনও ‘দিদি’র জায়গাটা অটুট আছে। আজ তাঁকে প্রমাণ করতে হবে, কর্মীরা দলের নেতাদের দেখে নয়, এখনও মমতার একটা ডাকেই ছুটে আসে। এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ গোটা দেশের রাজনৈতিক মহল তাকিয়ে আছে বাংলার দিকে। রাজনীতির আঙিনায় বহুবার ফিনিক্স পাখির মতো ছাই থেকে জেগে উঠেছেন তিনি। এই চরম সংকটের দিনে, পতনের মেঘ সরিয়ে বাংলার ‘অগ্নিকন্যা’ কি পারবেন আবার নতুন করে আগুনের শিখা ছড়াতে? উত্তর লুকিয়ে আছে ২০২৬-এর এই অগ্নিগর্ভ একুশে জুলাইয়ের বুকেই।