লড়াই যখন ভবিষ্যতের, তখন চুপ থাকা পাপ: রূপালী পর্দা ভুলে রাজপথে একজোট তারকারা

Bollywood stars stand with the student movement.

নিজস্ব প্রতিবেদন

মেধা কি তবে শুধুই এক দূর অস্ত স্বপ্ন? বছরের পর বছর ধরে দিন-রাত এক করে পড়াশোনা করা ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ কি শেষমেশ থমকে যাবে অব্যবস্থা আর দুর্নীতির কাছে? উত্তর খোঁজার এই লড়াইয়ে আজ উত্তাল গোটা দেশ। দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে শুরু করে চেন্নাইয়ের সচিবালয়—মেধাবী শিক্ষার্থীদের দীর্ঘশ্বাস আর স্লোগানে কাঁপছে পথঘাট। আর ছাত্রদের সেই লড়াইয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন রূপালী পর্দার একঝাঁক উজ্জ্বল তারকা। তারা শুধু সহমর্মিতা জানাননি, স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন—নিজের অধিকার চাওয়া কোনো অপরাধ হতে পারে না।

“ওরা এমন একটা ব্যবস্থা ডিজার্ভ করে যাকে বিশ্বাস করা যায়”: কারিনা কাপুর খান

নিজের দ্বিধা কাটিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় মনের আগ্নেয়গিরি উগরে দিয়েছেন বলিউড অভিনেত্রী কারিনা কাপুর খান। কয়েকদিনের নীরবতা ভেঙে তিনি লেখেন, “এত হাজার হাজার তরুণ কণ্ঠের যে আওয়াজ, তাকে উপেক্ষা করা অসম্ভব… আর করা উচিতও নয়। আমরা সবাই জানি একটা শিশুর জীবনে শিক্ষার গুরুত্ব কতটা। শিক্ষা আত্মবিশ্বাস দেয়, আশা দেয়, আর একটা পরিবারকে নিশ্চিত করে যে তাদের আগামীকালটা আজকের চেয়ে অন্তত ভালো হবে।” কারিনার মতে, আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা অন্তত এমন একটা ব্যবস্থা পাওয়ার যোগ্য যেখানে মেধার সত্যিকারের মূল্য আছে এবং পরিশ্রমের পুরস্কার পাওয়া যায় সমান অধিকারের ভিত্তিতে।

যন্তর মন্তরে বয়োবৃদ্ধ বলিরেখার প্রতিবাদী রূপ: শাবানা আজমি ও প্রকাশ রাজ

লড়াই যখন সংবিধান বাঁচানোর, তখন বয়সের ভারী ফ্রেম বাধা হতে পারে না। প্রবীণ অভিনেত্রী শাবানা আজমি নিজে পৌঁছে যান যন্তর মন্তরে। ‘চলো সংসদ’ মার্চের আগে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কোনো অপরাধ নয়, তা সংবিধানের দেওয়া অন্যতম মৌলিক অধিকার। সরকারের উচিত এই তরুণদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা।

অন্যদিকে, হাতে সংবিধানের প্রতিলিপি নিয়ে দিল্লি ছুটে এসেছেন অভিনেতা প্রকাশ রাজ। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির একাংশের নীরবতাকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আজ যদি আমরা যুবসমাজের পাশে না দাঁড়াতে পারি, তবে আমাদের এই জবাবদিহিতা কিসের?”

“সবকিছু মনে রাখা হবে!”: এক্স হ্যান্ডেলে বিস্ফোরক অরিজিৎ সিং

প্রতিবাদের এই আবহে সবচেয়ে জোরালো ও ঝাঁঝালো সুরটি এসেছে দেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী অরিজিৎ সিংয়ের কাছ থেকে। দিল্লিতে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তিনি। কোনো চাটুকারিতার ধার না ধেরে সরাসরি রাজনেতাদের ধুয়ে দিয়ে অরিজিৎ এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেলে লেখেন, “ইয়ার, এবার তো আপনারা এখানে ছাত্রদের গায়ে হাত তুলছেন! আপনাদের কি একটুও লজ্জা করে না!!??”

প্রশাসনকে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তিনি আরও লেখেন, “হ্যালো নেতা, মন্ত্রী!! কী চলছে ভাই!! নিজেদের কি ভগবান ভেবে নিয়েছেন নাকি?” এরপরেই একটি ঐতিহাসিক হুংকার ছেড়ে এই গায়ক লিখে দেন, “প্রতিটি বিষয় মনে রাখা হবে! মনে রাখবেন, একমাত্র পরিবর্তনই চিরন্তন।” অরিজিতের এই বিস্ফোরক বার্তা মুহূর্তের মধ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে নেটদুনিয়ায়, যা ছাত্র আন্দোলনকে এক অভূতপূর্ব গতি ও আবেগ জুগিয়েছে।

একই আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়ে মুম্বইতেও। সংহতি মিছিলে অংশ নিতে গিয়ে দাদারে মুম্বই পুলিশের হাতে আটক হন ‘ধুরন্ধর’ খ্যাত অভিনেত্রী আয়েশা খান। কিন্তু তাতেও তাঁর তেজ কমেনি। সমালোচকদের উদ্দেশ্যে তাঁর সোজা জবাব, “নিজের মেরুদণ্ড বিকিয়ে দেওয়ার চেয়ে আমি আমার কেরিয়ার হারিয়ে ফেলাকেও ভালো মনে করি।”

“ওদের শরীরে লাঠির আঘাত নয়, চাই ভালোবাসার স্পর্শ”: একসুরে নাসিরুদ্দিন, প্রীতি ও সোনু সুদ

আন্দোলনের ওপর পুলিশের বলপ্রয়োগ মেনে নিতে পারেননি সমাজসেবী ও অভিনেতা সোনু সুদ। তিনি স্পষ্ট জানান, আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর লাঠিচার্জ নয়, তাদের সাথে সহমর্মিতার সাথে কথা বলা উচিত। অভিনেতা রিতেশ দেশমুখ, দিয়া মির্জা, রিচা চড্ডা এবং স্বরা ভাস্করদের মতে—বাচ্চাদের আওয়াজ চেপে দেওয়া কোনো সমাধান হতে পারে না, সরকারকে অবিলম্বে আলোচনায় বসতে হবে।

প্রবীণ অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ, প্রীতি জিন্টা, হুমা কুরেশিদের মতো ব্যক্তিরা একইভাবে এই ছাত্র সমাজের প্রতি পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করেছেন। সমাজসেবী সোনাম ওয়াংচুকের অনশন আন্দোলনের প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রীতি জিন্টা ও হুমা কুরেশি বলেন, “এই তরুণরা এবং সোনাম আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে উন্নত করার যে লড়াই লড়ছেন, তাকে আমার স্যালুট। তবে আমরা চাই সোনাম অবিলম্বে অনশন ভাঙুন, কারণ এই লড়াইয়ে তাঁর সুস্থ থাকাটাও জরুরি।”

অভিনেতা দিলজিৎ দোসাঞ্জ, কমেডিয়ান বীর দাস, আর মাধবন, আলিয়া ভাট, কামাল হাসান, দুলকার সালমান, রোহিত সররাফদের মতো ব্যক্তিত্বরাও এই যুব আন্দোলনের সমর্থনে সরব হয়েছেন।

যখন একঝাঁক তারকা রাস্তায়, তখন কোথায় ‘বিগ বি’ ও ‘মিষ্টার পারফেক্টশনিস্ট’?

প্রতিবাদের এই উত্তাল তরঙ্গের মাঝেও বলিউডের এক হেভিওয়েট অংশ কিন্তু বেছে নিয়েছে নিশ্ছিদ্র নীরবতা। আর এই নীরবতা নিয়েই এখন ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন নেটিজেনরা। দীর্ঘদিনের অভিভাবকতুল্য মেগাস্টার অমিতাভ বচ্চন থেকে শুরু করে ‘থ্রি ইডিয়টস’ সিনেমার মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থার গলদ নিয়ে রূপালী পর্দায় ঝড় তোলা আমির খানের মতো প্রথম সারির মহাতারকাদের কোনো অবস্থান না নেওয়াটা মেনে নিতে পারছেন না সাধারণ মানুষ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উঠছে ঝাঁঝালো প্রশ্ন—যে আমির খান পর্দায় ‘র‍্যাঞ্চো’ সেজে ছাত্রদের অধিকারের পাঠ পড়িয়েছিলেন, বাস্তব জীবনে ছাত্রদের এই চরম সংকটে তিনি কোথায়? আর প্রতিটি জাতীয় বিষয়ে নিজের মতামত জানানো বিগ বি-ই বা কেন আজ চুপ? নেটিজেনদের স্পষ্ট বক্তব্য, দেশের যুবসমাজ যখন নিজেদের ভবিষ্যতের লড়াইয়ে রাজপথে মার খাচ্ছে, তখন তারকাদের এই হিসাব-নিকাশ করা নীরবতা আসলে এক ধরণের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।

এক নজরে আন্দোলনের মূল সুর:

  • মেধার জয় বনাম দুর্নীতি: NEET-UG পরীক্ষার অনিয়ম তুলে ধরে শিক্ষার্থীদের মূল দাবি—স্বচ্ছতা ও সমতা।
  • দিল্লি থেকে চেন্নাই: দেশের প্রতিটা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে এই ক্ষোভের আগুন, আটক বহু শিল্পী ও কর্মী।
  • অরিজিতের হুংকার: “নিজেদের ভগবান ভাবছেন নাকি?”—পুলিশি অনাচারের বিরুদ্ধে চরম তোপ জনপ্রিয় গায়কের।
  • তারকাদের দুই মেরু: একদিকে রাজপথে নেমে লড়াই, অন্যদিকে এ-লিস্ট তারকাদের বিতর্কিত নীরবতা নিয়ে সরগরম নেটদুনিয়া।

আজ গোটা দেশ তাকিয়ে আছে রাজপথের দিকে। রূপালী পর্দার এই সমর্থন প্রতিবাদের এই আগুনকে যে বহু দূর নিয়ে যাবে, তা নিশ্চিত। প্রশ্ন এখন একটাই—যে তরুণরা আগামী দিনের দেশ গড়ে তুলবে, তাদের বুকফাটা চিৎকার কি শুনতে পাবে প্রশাসন?