ক্ষমতার অলিন্দে সুযোগ সন্ধানের রাজনীতি: ইতিহাস কি নিজেরই পুনরাবৃত্তি করছে?

Trinamool MPs leave Mamata to join the BJP camp

বিশেষ প্রতিবেদন

ইতিহাসের এক অদ্ভূত ও নির্মম পরিহাসের সাক্ষী থাকছে বাংলা। রাজনীতিতে আদর্শের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে ব্যক্তি স্বার্থ ও ক্ষমতার অলিন্দে টিকে থাকার তাড়না। আক্ষরিক অর্থেই—ইতিহাস ঘুরে ফিরে আসে। যে কৌশলে চার দশক আগে এক তরুণী রাজনীতিক বঙ্গ রাজনীতির অলিন্দে নিজের মাটি শক্ত করেছিলেন, আজ সেই একই কৌশলের শিকার হতে হচ্ছে তাঁকে নিজেই।

কংগ্রেসের সঙ্গে সমীকরণ: বারবার দূরত্ব ও আজকের বাধ্যবাধকতা

নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিজেপি তথা এনডিএ (NDA)-র হাত ধরা তৎকালীন রাজনীতিতে ছিল এক অভূতপূর্ব মোড়। অটল বিহারী বাজপেয়ীর মন্ত্রিসভায় মমতা ছিলেন প্রথম সারির মুখ। অটলজি নিজে কলকাতার কালীঘাটে মমতার টালির চালে গিয়ে তাঁর মায়ের চরণ স্পর্শ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সেই এনডিএ-র সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে মমতা হাত মেলান কংগ্রেসের সঙ্গে। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—৩৪ বছরের অদম্য বাম শাসনের অবসান ঘটানো। ২০১১ সালে সেই লক্ষ্য পূরণ হলেও, কংগ্রেসের সঙ্গেও বেশিদিন জোট টেকেনি। ক্ষমতার রাজনীতিতে নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে বারবার বিজেপির কাছাকাছি গিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছেন তিনি।

এমনকি গত কয়েক বছরে জাতীয় স্তরে ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোটে থেকেও রাহুল গান্ধীর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পিছপা হননি মমতা। অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদব, অরবিন্দ কেজরিওয়াল কিংবা উদ্ধব ঠাকরেদের সঙ্গে নিয়ে কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে বা কোণঠাসা করে এক বিকল্প আঞ্চলিক শক্তি গড়ার চতুর চেষ্টা চালিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু রাজনীতির কী অদ্ভুত মোড়—যে কংগ্রেসকে তিনি বারবার দূরে ঠেলেছেন, রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার এই চরম দুঃসময়ে সেই কংগ্রেসই আজ তাঁর প্রধান ভরসা ও খড়কুটো হয়ে দাঁড়িয়েছে!

মমতার তৈরি হাতিয়ার এবং মে ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট

২০১১-র পর বাংলায় ক্ষমতায় বসার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে সে সময় তাঁর ডানহাত মুকুল রায় এবং তরুণ তুর্কি শুভেন্দু অধিকারীদের প্রধান কাজই হয়ে উঠেছিল প্রদেশ কংগ্রেসকে কার্যত সাইনবোর্ডে পরিণত করে বিরোধীদের অস্তিত্ব মুছে দেওয়া। বিরোধীশূন্য রাজনীতির যে খেলা তিনি শুরু করেছিলেন, আজ তার রূপ সম্পূর্ণ উল্টো।আজকের দৃশ্যপটে যে শুভেন্দু অধিকারী একসময় তৃণমূল কংগ্রেসের সংগঠনের মূল কারিগর ছিলেন, আজ তিনিই রাজ্যের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। আর রাজনৈতিক মঞ্চের এই নাটকীয় মোড়ে অলিখিত ভাবে তৃণমূল ছেড়ে আসা বিধায়ক-সাংসদদের চালনা করছেন তিনিই।

বাংলায় ২০২৬-এর রাজনৈতিক পালাবদলের পর তৃণমূলের ২৮ জন লোকসভা সাংসদের মধ্যে ২০ জনই ‘এনসিপিআই’ নামক নতুন শিবিরের পতাকা তলে এসে হাত মিলিয়েছেন এনডিএ-র সঙ্গে। সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, শতাব্দী রায়, সায়নী ঘোষ কিংবা কাকলি ঘোষ দস্তিদার—যাঁরা একসময় মমতার ‘কিচেন ক্যাবিনেটের’ অত্যন্ত বিশ্বস্ত সদস্য ছিলেন, আজ তাঁদেরকেই দেখা যাচ্ছে নয়া দিল্লির এনডিএ বৈঠকে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে প্রথম সারিতে বসেঠেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার ! পাশাপাশি, রাজ্যসভায় সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব কিংবা কোয়েল মল্লিকের মতো মুখগুলির মেরুকরণ এবং বিজেপির টিকিটে পুনর্বাসন প্রমাণ করে—অনৈতিক দলবদলের এই সংস্কৃতি বাংলায় এক নতুন রেকর্ড গড়েছে।

জনসমর্থন বনাম রাজনৈতিক পিঠ বাঁচানোর লড়াই

তবে এই বিপুল ভাঙনের মধ্যেও একটি মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে রয়েছে তাঁর নিজস্ব, একচ্ছত্র জনসমর্থন। সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনেও আড়াই কোটির বেশি ভোটার যে রায় দিয়েছেন, তা তৃণমূল নামক প্রতীকের চেয়েও অনেক বেশি ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়’ নামক ব্র্যান্ডের প্রতি আস্থা। তাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শত চেষ্টা করলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বঙ্গ রাজনীতি থেকে অপাঙ্কতেও করা বা মুছে ফেলা অসম্ভব।

তাহলে কেন এই গণ-দলবদল? রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা নাকি দুর্নীতির জাঁতাকল থেকে নিজেদের ‘সেফ’ রাখা? স্পষ্টতই, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা এবং কেন্দ্রীয় সংস্থার হাত থেকে আত্মরক্ষা করতেই একসময়ের ‘বিশ্বস্ত সৈনিকেরা’ আজ মমতার পিঠে ছুরি মারতে দ্বিধা করেননি।

অনৈতিকতার ইতিহাস ও অস্পষ্ট ভবিষ্যৎ

যে বিজেপিকে একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের হাত ধরে বাংলায় পা রাখার সুযোগ করে দিয়েছিলেন, আজ সেই বিজেপিই তাঁর প্রধান রাজনৈতিক শত্রু। আর সেই শত্রুপক্ষেরই আশ্রয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে ব্যস্ত মমতারই তৈরি করা নেতারা, যাঁরা মোদীর সঙ্গে বৈঠকে বসে নিজেদের নিরাপদে রাখার পথ খুঁজে নিচ্ছেন।

কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, জনসমর্থনহীন দলবদলুদের রাজনৈতিক আয়ু কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মমতার দেখানো ‘ক্ষমতার অলিন্দে থাকার পথ’ ধরে যাঁরা আজ বিজেপির ছায়াতলে আত্মগোপন করছেন, তাঁদের এই সাময়িক স্বস্তি দীর্ঘমেয়াদে অন্ধকারের দিকেই ঠেলে দেবে। ২০২৯-এর লক্ষ্য নিয়ে বিজেপি হয়তো এখন মমতাকে কোণঠাসা করার চাল চালছে, কিন্তু বাংলার রাজনীতিতে অনৈতিকতার এই নতুন অধ্যায় শেষ পর্যন্ত কাকে কোথায় দাঁড় করাবে—তার বিচার করবে সময়ের আদালতই।