Mamata’s solitary ‘comeback’ and some uncomfortable questions
বিশেষ প্রতিবেদন :
প্রতি বছর ২১ জুলাই কলকাতা শহরটা স্তব্ধ হয়ে যায় এক অলিখিত আবেগে। কিন্তু ২০২৬-এর এই ২১ জুলাই যেন ছিল অন্য রাজনৈতিক সমীকরণের ক্ষেত্র। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের অভাবনীয় ব্যর্থতা, জোড়াফুল প্রতীকের ওপর আইনি ঝুলন্ত তলোয়ার, দলের বড় অংশের বিধায়ক-সাংসদের দলত্যাগ এবং শুভেন্দু অধিকারীর প্রকাশ করা একুশে জুলাই কমিশনের ফাইলের অভিঘাত—সব মিলিয়ে লড়াইটা ছিল অস্তিত্ব রক্ষার।
কিন্তু গত রাতের সব বাধা এবং আজ ভিক্টোরিয়া লাগোয়া ক্যাথিড্রাল রোডের জনপ্লাবন একটা কথা পরিষ্কার করে দিল: দল ভাঙতে পারে, প্রতীক হারাতে পারে, কিন্তু মমতার আসল ‘ডিএনএ’—অর্থাৎ তাঁর রাস্তার জনসমর্থন—এখনও তাঁকে সম্পূর্ণ ছেড়ে যায়নি।
রাতের অন্ধকার, ভাঙা মঞ্চ ও ‘রাস্তার মমতা’
২১ জুলাইয়ের আগের মধ্যরাতের ঘটনাগুলো যেন নব্বইয়ের দশকের রাজনৈতিক দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। আদালতের নির্দেশে সভা করার অনুমতি মিললেও রাতভর সভামঞ্চ ভাঙচুর, তার কেটে দেওয়া, কিংবা কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ যখন আপনাকে থামানোর জন্য চরম পথ বেছে নেয়, তখন তারা অজান্তেই আপনাকে আপনার সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গায় ফিরিয়ে আনে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক শক্তি কোনো দিনই সুসজ্জিত শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে ছিল না; তাঁর শক্তি ছিল প্রতিবাদের রাস্তায়, লড়াইয়ের ময়দানে। রাতের অন্ধকারে কুণাল ঘোষ কিংবা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে স্বয়ং দলনেত্রীর মঞ্চ পাহারা দেওয়ার দৃশ্য সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের কাছে শুধু একটি রাজনৈতিক বার্তা নয়, এটি ছিল গভীর এক আবেগের স্ফুলিঙ্গ।
“আমাদের ঈশ্বরও আশীর্বাদ ঢেলে দিলেন। বিজেপি স্পনসর্ডদের মাথা ঢাকা, আর আমাদের খোলা আকাশ। উনিই রক্ষা কবচ।”
— মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
অভিষেককে ঘিরে রক্ষাকবচ: নেত্রীর স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা
একুশের মঞ্চ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল অন্য একটি কারণে। দলত্যাগী নেতা মদন মিত্র থেকে শুরু করে বিরোধীরা যখন সমস্ত ব্যর্থতার দায়ভার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাঁধে চাপিয়ে তাঁর ওপর আক্রমণ শাণিত করছিলেন, ঠিক তখনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝিয়ে দিলেন—অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি কোনোভাবেই হাতছাড়া করবেন না।
অভিষেকের পাশে দাঁড়ানোর পেছনে মমতার শক্তিশালী যুক্তি ও রাজনৈতিক সমীকরণগুলো একুশের সভা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে:
১. ‘নকল বেড়াল তপস্বী’ এবং দলত্যাগীদের কড়া বার্তা
মদন মিত্রদের মতো পুরোনো অনুগামীদের সরে যাওয়া বা ‘নব তৃণমূল’ গঠনের যে হাওয়া তৈরি হয়েছিল, একুশের মঞ্চ থেকে মমতা তা এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। দলত্যাগীদের উদ্দেশ্যে তাঁর “বিজেপির পাশবালিশ না হয়ে সরাসরি বিজেপিতে যান” বা “একটি গদ্দারকেও আর ফেরাব না” বার্তাটি স্পষ্ট করে দেয় যে, দল পুনর্গঠনে তিনি এবার কোনো আপস করবেন না।
২. আইনি লড়াই ও প্রতীকের অধিকার
শুভেন্দু অধিকারী বা কেন্দ্রীয় এজেন্সির চাপ যতই থাকুক, মমতা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—তিনি এই দলের ‘ফাউন্ডার প্রেসিডেন্ট’। প্রতীক বা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট কাড়ার চেষ্টা হলে লড়াই সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়াবে।
বাংলার রাজনীতিতে কি মমতাকে মুছে ফেলা সম্ভব?
আজকের এই ঐতিহাসিক সমাবেশের পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সামনে একটাই বড় প্রশ্ন: বাংলা থেকে কি সত্যিই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম মুছে ফেলা সম্ভব?
উত্তরটা হলো—সহজ নয়।
ক্ষমতা হারানোর পর সাধারণত একটি রাজনৈতিক দলে যে ধস নামে, তৃণমূলের ক্ষেত্রেও তা হয়েছে। সাংসদ-বিধায়করা দল ছেড়েছেন, নতুন গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। কিন্তু আজ ক্যাথিড্রাল রোডের খোলা আকাশের নীচে কোনো বড় তারকার উপস্থিতি ছাড়াই যে অগণিত সাধারণ মানুষের ভিড় দেখা গেল, তারা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিল:
- নেতা বনাম মমতা: রাজবাড়ির নেতা বা ক্ষমতার অলিন্দে থাকা বিধায়করা হয়তো দল ছাড়তে পারেন, কিন্তু ‘মমতা’ নামক আবেগটি নিচু তলার মানুষের মন থেকে রাতারাতি উপড়ে ফেলা অসম্ভব।
- ‘ইন্ডিয়া’ জোট ও দিল্লি চলো: জাতীয় স্তরে বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার যে বার্তা তিনি দিয়েছেন, তা প্রমাণ করে যে রাজ্য রাজনীতিতে ব্যাকফুটে থাকলেও জাতীয় রাজনীতির দাবার বোর্ডে তিনি নিজেকে এখনো অন্যতম বড় খেলোয়াড় হিসেবেই ভাবেন।
আগামী দিনের পথ: সাতানব্বইয়ের পুনরাবৃত্তি?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মঞ্চ থেকে মনে করিয়ে দিয়েছেন—“সাতানব্বইতে লড়েছি, ছাব্বিশেও পারব।” ১৯৯৭ সালে কংগ্রেস ছেড়ে যখন তিনি একা বেরিয়ে এসেছিলেন, তখন তাঁর সঙ্গে কোনো ক্ষমতা ছিল না, ছিল শুধু জেদ আর মানুষের ভালোবাসা। ২০২৬-এর এই কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে মমতা আবার সেই ১৯৯৭-এর শূন্য থেকেই শুরু করতে চাইছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমাণ করে দিলেন, ক্ষমতা বা সরকারি অনাক্রম্যতা হয়তো সাময়িকভাবে কাড়া যায়, কিন্তু এক লড়াকু নেত্রীর রাজনৈতিক আবেদন মুছে ফেলা এত সহজ নয়। আগামী দিনে ব্যাট-বলের খেলা কতটা জমে উঠবে, তা সময়ই বলবে—তবে লড়াইটা যে এখনও শেষ হয়নি, একুশের মঞ্চ তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল।
