History Of Jantar Mantar Delhi
বিশেষ প্রতিবেদন
দিল্লি বললে চোখের সামনে ভেসে ওঠে লাল কেল্লা, কুতুব মিনার কিংবা ইন্ডিয়া গেট। কিন্তু গত কয়েক দশকে দিল্লির বুক চিরে যে নামটি ভারতের প্রতিটি সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ, লড়াই এবং গণতন্ত্রের প্রতিধ্বনিতে পরিণত হয়েছে, তা হলো—যন্তর মন্তর।
সম্প্রতি লাদাখের পরিবেশকর্মী সোমন ওয়াংচুকের আন্দোলন, ‘ককরোজ জনতা পার্টি’র ক্ষোভ ও অন্যান্য সাম্প্রতিক নাগরিক আন্দোলনের জেরে ‘যন্তর মন্তর’ নামটি আবারও প্রতিটি মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। সাধারণ মানুষের দাবিদাওয়া আদায় করা, অনশন, কিংবা সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরব হওয়ার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও ঐতিহাসিক মঞ্চ হয়ে উঠেছে এই স্থান। কিন্তু কেবলই কি এটি এক রাজনৈতিক ধরণার মাঠ? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে কয়েক শতাব্দী প্রাচীন এক বৈজ্ঞানিক ও স্থাপত্যের ইতিহাস?
আজকে আমরা জেনে নেব যে যন্তর মন্তরকে কেন্দ্র করে আজ গোটা দেশের চোখ আটকে থাকে, তার গড়ে ওঠার নেপথ্যের ইতিহাস এবং কোন কোন ঐতিহাসিক রাজনৈতিক আন্দোলনের সাক্ষী হয়ে রয়েছে এই স্থান।
১. যন্তর মন্তরের গড়ে ওঠার ইতিহাস: জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক বিস্ময়
যন্তর মন্তর নামটির পেছনে রয়েছে গভীর এক বৈজ্ঞানিক ও ভাষাগত অর্থ। সংস্কৃত শব্দ ‘যন্ত্র’ (যার অর্থ সরঞ্জাম বা যন্ত্র) এবং ‘মন্ত্র’ (যার অর্থ গণনা করা বা পরিমাপ করা) থেকে এই শব্দের উৎপত্তি। অর্থাৎ ‘যন্তর মন্তর’ শব্দের মূল অর্থ হলো ‘গণনা করার যন্ত্র’।
- কার হাত ধরে নির্মিত হয়? অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে, তৎকালীন জয়পুরের মহারাজা দ্বিতীয় জয় সিং (সওয়াই জয় সিং) দিল্লির এই স্থাপত্যটি গড়ে তোলেন। মহারাজা সওয়াই জয় সিং কেবল একজন দক্ষ শাসকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অসামান্য জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতপ্রেমী।
- তৈরির সময়কাল ও উদ্দেশ্য: ১৭২৪ সালে দিল্লির এই যন্তর মন্তরের নির্মাণকাজ শুরু হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল মহাকাশের গ্রহ, নক্ষত্র ও সূর্যের অবস্থান সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং নির্ভুল ক্যালেন্ডার ও পঞ্চাঙ্গ (পঞ্জিকা) তৈরি করা। তৎকালীন সময়ে কাঠের বা ছোট ধাতব তৈরি যন্ত্রপাতির চেয়ে এই বিশালাকার পাথরের তৈরি স্থাপত্যগুলো দিয়ে মহাজাগতিক গতিবিধি অনেক বেশি নির্ভুলভাবে মাপা যেত।
- স্থাপত্যের মূল আকর্ষণ: দিল্লির যন্তর মন্তরে মূলত ১৩টি ভিন্ন জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত যন্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- সম্রাট যন্ত্র: এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সূর্যঘড়িগুলির একটি, যা ছায়ার ওপর নির্ভর করে একদম সঠিক সময় গণনা করতে পারে।
- জয় প্রকাশ যন্ত্র: গোলার্ধের আকৃতির এই যন্ত্রটি ছায়াপথের গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান মেপে দেখায়।
- রাম যন্ত্র: খোলা ছাদের এই গোলাকার নির্মাণটি নক্ষত্রের উচ্চতা ও কোণ নির্ণয় করতে ব্যবহৃত হতো।
জয় সিং দিল্লি ছাড়াও জয়পুর, বারাণসী, মথুরা এবং উজ্জয়িনীতে এমন আরও চারটি যন্তর মন্তর তৈরি করেছিলেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানের ধারা বদলালেও দিল্লির যন্তর মন্তরের ভাগ্য অন্য এক মোড় নেয়।
২. প্রতিবাদের নতুন ঠিকানা: কীভাবে আন্দোলনের মূল কেন্দ্র হয়ে উঠল যন্তর মন্তর?
বিশ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত যন্তর মন্তর ছিল মূলত একটি সংরক্ষিত প্রাচীন ঐতিহাসিক সৌধ। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকের শেষদিকে ও ২০০০-এর দশকের শুরুতে ভারতের রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তন আসে।
পূর্বে দিল্লির ‘বোট ক্লাব’ (ইন্ডিয়া গেটের কাছে) রাজনৈতিক সমাবেশ ও আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র ছিল। কিন্তু ১৯৯৩ সালে তৎকালীন সরকার ট্রাফিক ব্যবস্থা রক্ষা ও নিরাপত্তার সুবিধার্থে বোট ক্লাবে বড় ধর্মঘট ও প্রতিবাদ সমাবেশ নিষিদ্ধ করে। এরপরই প্রশাসন থেকে আন্দোলনকারীদের জন্য দিল্লির সংসদ ভবনের খুব কাছে অবস্থিত যন্তর মন্তর রোড-কে নির্দিষ্ট প্রতিবাদস্থল বা ‘ডেসিসনেটেড প্রটেস্ট সাইট’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
সংসদ ভবন থেকে সামান্য দূরত্বে হওয়ায় দেশজুড়ে যেকোনো অন্যায়, ক্ষোভ বা দাবির কথা সোজা সরকারের কানে পৌঁছানোর জন্য যন্তর মন্তরই হয়ে ওঠে সেরা জায়গা।
৩. ইতিহাসের পাতায় যন্তর মন্তর: সাক্ষী বড় বড় আন্দোলনের
গত তিন দশকে যন্তর মন্তর ভারতের বহু বাঁক-বদলকারী গণআন্দোলন ও ঐতিহাসিক ঘটনার নীরব সাক্ষী থেকেছে:
- আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন (২০১১): ভারতের আধুনিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় গণআন্দোলনগুলোর একটি ছিল এটি। লোকপাল বিল পাসের দাবিতে বিশিষ্ট সমাজসেবী আন্না হাজার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। এই আন্দোলনের উত্তাপ দিল্লির রামলীলা ময়দানের পাশাপাশি যন্তর মন্তরেও তীব্রভাবে আছড়ে পড়েছিল এবং এই আন্দোলন থেকেই ভারতীয় রাজনীতির বেশ কিছু নতুন মুখের উত্থান ঘটেছিল।
- নির্ভয়া কাণ্ডের গণবিক্ষোভ (২০১২): ২০১২ সালের ডিসেম্বরে দিল্লির রাস্তায় ঘটে যাওয়া নৃশংস ঘটনার পর পুরো দেশের তরুণ সমাজ ও সাধারণ মানুষ কোনো দলীয় ব্যানার ছাড়াই যন্তর মন্তরে জমা হয়েছিলেন। টানা কয়েকদিনের স্বতঃস্ফূর্ত অনশন, মোমবাতি মিছিল এবং আন্দোলনের মুখে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত দেশের নারী সুরক্ষার আইন কঠোর করতে বাধ্য হয় তৎকালীন সরকার।
- এক পদ এক পেনশন (OROP) আন্দোলন (২০১৫): ভারতের অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মী ও জওয়ানেরা তাঁদের দীর্ঘদিনের পাওনা ‘এক পদ এক পেনশন’-এর দাবিতে মাসের পর মাস যন্তর মন্তরে অবস্থান বিক্ষোভ ও অনশন চালিয়েছিলেন। এটি ছিল ভারতের প্রতিরক্ষা কর্মীদের অধিকার আদায়ের অন্যতম সংবেদনশীল ও বড় আন্দোলন।
- কৃষক আন্দোলন ও চালকদের প্রতিবাদ: কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে এবং পরিবহন খাতের নতুন নিয়মের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে আসা কৃষক ও পরিবহন শ্রমিকরা তাঁদের দাবি তুলে ধরতে বারবার যন্তর মন্তরের রাজপথকেই বেছে নিয়েছিলেন।
- কুস্তিগীরদের অবস্থান ধর্মঘট (২০২৩): ভারতের প্রথম সারির অলিম্পিক পদকজয়ী কুস্তিগীরেরা ক্রীড়া ফেডারেশনের শীর্ষ কর্তাদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগে যন্তর মন্তরের ফুটপাতে দীর্ঘদিন ধর্নায় বসেছিলেন। দেশের ক্রীড়াজগত ও সাধারণ মানুষের আবেগ যেভাবে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, তা যন্তর মন্তরকে বিশ্বব্যাপী সংবাদ শিরোনামে এনে দেয়।
গণতন্ত্রের জীবন্ত লাইটহাউস
অষ্টাদশ শতকে যা তৈরি হয়েছিল আকাশের নক্ষত্র ও গ্রহের গতিপথ মেপে দেখার জন্য, একুশ শতকে এসে সেই যন্তর মন্তরই হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের গতিপথ ঠিক করার মঞ্চ।
আজকের সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে বিভিন্ন পড়ুয়াদের অনশন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের নানা ছোট-বড় ক্ষোভ—যন্তর মন্তর প্রমাণ করে যে, ভারতে গণতন্ত্র এখনও জীবিত। এটি কেবল পাথরের তৈরি কিছু স্থাপত্য নয়, এটি কোটি কোটি ভারতীয়র আশা, আকাঙ্ক্ষা, ক্ষোভ এবং অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার এক নিঃশব্দ অথচ বজ্রকণ্ঠের প্রতীক। লাল ফিতার দৌরাত্ম্য আর ক্ষমতার দাপটের মাঝে যন্তর মন্তর আজও সাধারণ মানুষকে শেখায়—“প্রশ্ন তোলো, দাবি জানাও, গণতন্ত্র তো তোমারই!”
