ক্ষুধার জ্বালায় সন্তানকে হত্যা: এক মায়ের অপরাধ নয়, রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ দেউলিয়াপনা! কড়া পর্যবেক্ষণ গুজরাট হাইকোর্টের

প্রতীকি ছবি

Mother seeks justice for killing her child due to the pangs of hunger.

বিশেষ প্রতিবেদন

পেটের খিদে বড় ভয়ংকর। সেই খিদের চোটে যখন দু’বছরের ছোট্ট শিশুটি বারবার মায়ের কাছে এক মুঠো খাবারের জন্য কেঁদে উঠেছিল, তখন অসহায়তার চরমে পৌঁছে যাওয়া মা হয়তো স্থির থাকতে পারেননি। খিদের তাড়নায় কাঁদতে থাকা দু’বছরের শিশুকন্যাকে মারধর করেন মা, আর তাতেই মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটে এক অবোধ শিশুর।

জাতীয় দৈনিক ‘দি হিন্দু’ (The Hindu)-র প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুজরাটের সুরাটের এই মর্মান্তিক ঘটনা সম্প্রতি নাড়িয়ে দিয়েছে পুরো আইনি ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রকে। কিন্তু এই ঘটনাকে শুধুই আর পাঁচটা ‘খুনের অপরাধ’ হিসেবে দেখতে রাজি হয়নি গুজরাট হাইকোর্ট। আদালতের পর্যবেক্ষণ— যখন খিদের জ্বালা বা অনাহার একজন মাকে এই চরম পদক্ষেপে বাধ্য করে, তখন তা আর কেবল একজন ব্যক্তিবিশেষের অপরাধ থাকে না; তা পুরো রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সমাজব্যবস্থার যৌথ ব্যর্থতাকে তুলে ধরে।

ঠিক কী ঘটেছিল সুরাটে?

প্রশাসন ও মামলা সূত্রের খবর, গত মার্চ মাস থেকে জেলবন্দি ছিলেন সুরাটের বাসিন্দা লাখিবেন সোলাঙ্কি। তাঁর দুই বছরের শিশুকন্যা ইশা খিদের জ্বালায় ছটফট করছিল এবং বারবার মায়ের কাছে খাবার চাইছিল। বাড়িতে চরম দারিদ্র্য ও অনাহার, সন্তানের মুখে তুলে দেওয়ার মতো এক দানা শস্যও ছিল না মায়ের কাছে। খিদের যন্ত্রণায় শিশুর ক্রমাগত কান্নাকাটিতে দিশেহারা হয়ে চরম মানসিক অবক্ষয়ের মুহূর্তে নিজের সন্তানকে মারাত্মকভাবে মারধর করেন লাখিবেন। আঘাত সহ্য করতে না পেরে প্রাণ হারায় ছোট্ট ইশা। ঘটনাটি জানাজানি হতেই পুলিশ লাখিবেনকে গ্রেফতার করে।

“সামাজিক ন্যায়বিচারের পরাজয়”: আদালতের তীব্র পর্যবেক্ষণ

গত সপ্তাহে এই মামলার শুনানি চলাকালীন বিচারপতি হাসমুখ ডি সুথার লাখিবেন সোলাঙ্কির জামিন মঞ্জুর করেন। জামিন দেওয়ার সময় বিচারপতি অত্যন্ত কড়া ও কঠোর ভাষায় রাষ্ট্র ও সমাজের ভূমিকা নিয়ে বেশ কিছু ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন:

  • যৌথ ব্যর্থতা: আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানায়, এই ঘটনাকে কেবল একক অপরাধ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। চরম দারিদ্র্য ও অনাহার থেকে প্রান্তিক পরিবারগুলোকে রক্ষা করতে রাষ্ট্র ও সমাজের কাঠামোগত ব্যর্থতারই প্রতিফলন এই মর্মান্তিক কাণ্ড।
  • মৌলিক অধিকার ভঙ্গ: প্রতিটি মানুষের খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার সামাজিক ন্যায়বিচারের মূল স্তম্ভ। কিন্তু অনাহার যখন একজন মাকে সন্তানহত্যার মতো চরম সীমানায় ঠেলে দেয়, তখন বুঝতে হবে আমাদের সমাজকল্যাণমূলক পরিকাঠামো কতটা অন্তঃসারশূন্য।
  • রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব: আদালত স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শিশু ও অসহায় মানুষদের খাদ্য, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

দারিদ্র্য কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, মানব মর্যাদার সংকট

হাইকোর্ট তাঁর আদেশে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে, এই ঘটনা আমাদের চোখ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে দারিদ্র্য বা ক্ষুধা শুধুই একটা অর্থনৈতিক সূচক বা হিসাবের অঙ্ক নয়; এটি সরাসরি মানুষের মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের সঙ্গে যুক্ত।একজন মা কেন খাবার দিতে না পেরে নিজের সন্তানকেই হারিয়ে ফেলবেন?—এই উত্তর আজও অনুত্তরিত। আদালতের এই রায় শুধু একজন অসহায় মাকে আইনি মুক্তি দিল না, বরং আমাদের ঝলমলে উন্নয়ন আর অগ্রগতির দাবি করা সমাজের মুখের ওপর বসিয়ে দিল এক মস্ত বড় প্রশ্নচিহ্ন।কোনো মা বা শিশু যেন আর ক্ষুধার জ্বালায় এমন নির্মম পরিণতির শিকার না হয়, তার জন্য এখনই প্রশাসন ও সমাজকে জাগ্রত হওয়ার কড়া বার্তা দিয়েছে গুজরাট হাইকোর্ট।