Abhishek Banerjee Targeted During Sonarpur Visit
নিজস্ব প্রতিবেদন :
পঞ্চায়েত ভোট পরবর্তী রাজনৈতিক সংঘর্ষের আবহে শনিবার ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য একেবারেই ঘটনাবহুল দিন। দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত একের পর এক নাটকীয় ঘটনার সাক্ষী থাকল রাজ্যের রাজনীতি।
শনিবার দুপুরে কলকাতার হরিশ মুখার্জি রোডে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবন ‘শান্তিনিকেতন’-এ পৌঁছয় সিআইডির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। সই জাল সংক্রান্ত মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তৃণমূল সাংসদকে হাজির হওয়ার নির্দেশ সম্বলিত নোটিশ নিয়ে সেখানে যান তদন্তকারী আধিকারিকরা।
পরে অভিষেক কালিঘাটের অন্য একটি বাড়িতে গেলে সেখানেই তিনি সিআইডির নোটিশ গ্রহণ করেন। নোটিশ হাতে পাওয়ার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি তীব্র প্রতিক্রিয়া দেন। অভিষেক বলেন, “আমি ইডি কিংবা সিবিআই-এর সামনেই মাথা নত করিনি, তাহলে সিআইডি কোন ছার! ওদের ১০ পুরুষ এসেও যদি আমার ঘর-অফিস ভেঙে দেয়, তাও আমি দমবার পাত্র নই।”
সিআইডির নোটিশ ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক যখন তুঙ্গে, তখনই পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী নির্বাচনী হিংসায় নিহত তৃণমূল কর্মীদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়ে পড়েন তিনি। প্রথমে বেলেঘাটায় গিয়ে নিহত এক তৃণমূল কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিধায়ক কুণাল ঘোষ। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন অভিষেক।
এরপর সোনারপুরে নিহত আর এক তৃণমূল কর্মী সঞ্জুর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে রওনা দেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু সেখানেই পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হতে শুরু করে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কনভয় কামালগাজি মোড়ে সিগন্যালের সামনে দাঁড়াতেই কয়েকজন মহিলা ও পুরুষ তাঁর গাড়ির সামনে এসে কালো পতাকা দেখাতে শুরু করেন। এরপর শুরু হয় ‘চোর-চোর’ স্লোগান। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
অভিযোগ, সোনারপুরে যে রাস্তায় অভিষেকের যাওয়ার কথা ছিল, তার দু’ধারে আগে থেকেই একদল মানুষ জমায়েত করেছিলেন। স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা চলছিল বলেও দাবি করা হয়। পরিস্থিতি বুঝে গাড়ি থেকে নেমে বাইকে করে নিহত কর্মীর বাড়িতে পৌঁছনোর চেষ্টা করেন অভিষেক। নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি হেলমেটও পরেন। কিন্তু জনতার ভিড়ের কারণে সেই বাইকও মাঝপথে আটকে যায়।
এরপরই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অভিষেককে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া শুরু হয় বলে অভিযোগ। একের পর এক ডিম তাঁর দিকে ছোড়া হয়। পাশাপাশি উত্তেজিত জনতার একাংশের তরফে নানা স্লোগানও শোনা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খেতে হয় নিরাপত্তারক্ষীদের।
তৃণমূলের অভিযোগ, শুধু ডিম ছোড়াই নয়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর শারীরিক হামলাও চালানো হয়। ধস্তাধস্তির মধ্যে তাঁর জামা ছিঁড়ে যায় বলে দাবি করা হয়েছে। নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁকে ঘিরে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সেই সময় তাঁকে উদ্দেশ্য করে কটূক্তিও করা হয় বলে অভিযোগ।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই শেষ পর্যন্ত নিহত তৃণমূল কর্মী সঞ্জুর বাড়িতে পৌঁছন অভিষেক। সেখানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, “ওরা আমাকে প্রাণে মারতে চায়। মেরে দিক। আমার মৃতদেহ উদ্ধার হোক এখান থেকে। আমি সঞ্জুর বৃদ্ধ বাবা-মাকে ছেড়ে যাব না, যতক্ষণ না ফোর্স এসে উদ্ধার করবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি বেরিয়ে যেতেই পারি। কিন্তু সঞ্জুর বাবা-মায়ের উপর অত্যাচার হবে। ফোর্স না এলে আমি যাব না।”
এরপর কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তায় তাঁকে সেখান থেকে বের করে আনা হয়। পরে বাইপাস সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় অভিষেককে। সেখানে তাঁর প্রাথমিক চিকিৎসা হয়।
খবর পেয়ে হাসপাতালে পৌঁছন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেকের মা লতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিছুক্ষণ পর মমতা অভিযোগ করেন, হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরিষেবা মিলছে না। এরপর অভিষেককে মিন্টো পার্ক সংলগ্ন অন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, ভোট-পরবর্তী অশান্তির আবহে নিহত কর্মীদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর কর্মসূচি দিয়ে মাঠে নেমেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু দিনের শুরুতে সিআইডির নোটিশ এবং দিনের শেষে হামলার অভিযোগ— সব মিলিয়ে শনিবারের পুরো ঘটনাপ্রবাহ নতুন করে রাজ্যের রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়ে দিল। ময়দানে ফেরার প্রথম দিনেই যে অভিষেককে কেন্দ্র করে রাজনীতির পারদ চড়েছে, তা বলাই যায়।
