TMC Internal Crisis
বাংলার রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা। দীর্ঘদিন ক্ষমতার শীর্ষে থাকার পর ক্ষমতা হারিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। আর তার পরপরই দলের অন্দরে শুরু হয়েছে অভূতপূর্ব টানাপোড়েন। যে দলকে কেন্দ্র করে গত দুই দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে, সেই দলের ভিতরেই এখন নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শুরু হয়েছে প্রকাশ্য সংঘর্ষ।
একসময় তিল তিল করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে গড়ে ওঠা তৃণমূল কংগ্রেস আজ এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে দলের নির্বাচিত বিধায়কদের বড় অংশই কার্যত আলাদা অবস্থান নিয়েছেন। বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হওয়া ৮০ জন তৃণমূল বিধায়কের মধ্যে ইতিমধ্যেই দুই জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে দলের বিধায়ক সংখ্যা ৭৮। কিন্তু সংখ্যার হিসেবে আরও বড় ধাক্কা এসেছে মঙ্গলবার।
বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভার অধ্যক্ষের কাছে ৫৯ জন বিধায়কের সমর্থনপত্র জমা দিয়েছেন। সেই চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, পরিষদীয় দলের নেতা হিসেবে তাঁকেই নির্বাচিত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, বিধানসভার কক্ষেই অধ্যক্ষের সামনে উপস্থিত থেকে একাধিক বিধায়ক প্রকাশ্যে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁদের নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নিয়ম অনুযায়ী বিরোধী দলনেতা হওয়ার জন্য প্রয়োজন ন্যূনতম ৩০ জন বিধায়কের সমর্থন। সেই হিসাবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে থাকা বিধায়কদের সংখ্যা সেই সীমার অনেক ঊর্ধ্বে। ফলে বিধানসভার ভিতরে বিরোধী রাজনীতির নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে নতুন জল্পনা শুরু হয়েছে।
বিদ্রোহী শিবিরের তরফে ডেপুটি লিডার হিসেবে জাভেদ খান, সন্দীপন সাহা এবং শিউলি সাহার নাম ঘোষণা করা হয়েছে। মুখ্য সচেতক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন আখরুজ্জামান। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই সমস্ত সিদ্ধান্তের নথিতে এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের নেত্রী হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ লড়াইটা আপাতত মমতা বনাম ঋতব্রত নয়, বরং দলের সাংগঠনিক ও পরিষদীয় নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, সেই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে।
এদিকে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝেই তৃণমূল কংগ্রেসের সমস্ত সাংগঠনিক পদ ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। শুধু মূল সংগঠন নয়, বিভিন্ন শাখা সংগঠনের পদও বাতিল করা হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দলের ভিতরের অসন্তোষ ও পুনর্গঠনের পথ খোলা রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভারতের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে দলভাঙনের একাধিক নজির রয়েছে। মহারাষ্ট্রে একনাথ সিন্ধে শিবসেনার বড় অংশকে সঙ্গে নিয়ে উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। পরে অজিত পাওয়ারও শারদ পাওয়ারের এনসিপির একটি বড় অংশকে নিজের দিকে টেনে আনেন। এবার বাংলায় কি সেই ধরনের রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের সাক্ষী হতে চলেছে রাজ্য?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কিন্তু অন্য জায়গায়। তৃণমূল কংগ্রেস মানেই এতদিন ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ, তাঁর সংগ্রাম, তাঁর রাজনৈতিক লড়াই এবং তাঁর জনপ্রিয়তা। যে নেত্রীর নেতৃত্বে দল ক্ষমতায় এসেছে, যাঁর মুখ দেখেই ভোটে জিতেছেন অধিকাংশ বিধায়ক, সেই নেত্রীর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কি এবার দলের ভিতরেই প্রশ্নের মুখে?
সংখ্যার অঙ্ক আপাতত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে থাকলেও আবেগ, জনসমর্থন এবং দলের মূল প্রতীকের ওপর নিয়ন্ত্রণ এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতেই রয়েছে। ফলে আগামী দিনে আইনি, সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক— তিনটি ক্ষেত্রেই এই লড়াই আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এখন গোটা বাংলার নজর একটাই প্রশ্নে— তৃণমূল কংগ্রেসের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে? দলের প্রতীক, সংগঠন এবং রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের এই লড়াই শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই দেখার অপেক্ষায় রাজ্যবাসী।
